অধিক ডিম উৎপাদনে লেয়ার মুরগির খাবার তালিকাঃ তৈরি করা যাবে নিজেই!

প্রতিযোগিতামূলক এই বাজারে কার্যকরী একটি লেয়ার মুরগির খাবার তালিকা খুঁজে পাওয়া মানে হচ্ছে দক্ষতার সহিত ডিম উৎপাদন করে অন্য খামারির চেয়ে নিজেকে কিছুটা এগিয়ে রাখা।

চাইলেই নিজের ইচ্চামত দামে ডিম বিক্রি করা যায় না, কারণ বাজারে রয়েছে ডিমের দাম নির্ধারণকারী অনেক পক্ষ। কিন্তু চাইলে ডিম উৎপাদনের খরচ কিছুটা কমিয়ে নেওয়া যায়, যদি এসব ব্যাপারে নিজ থেকে কিছুটা ঘাঁটাঘাঁটি করা যায়।

সুতরাং, লেয়ার মুরগির খাবার তালিকা সম্পর্কে ঘাঁটাঘাঁটি করে যারা এই আর্টিকেল পড়ছেন, তারা অন্য খামারি চেয়ে কিছুটা অতিরিক্ত যেসব সুবিধা ভোগ করবেন তা হলোঃ

  1. নিজেই তার খামারের মুরগির জন্য খাবার তৈরি করতে পারবেন।
  2. অপেক্ষাকৃত অনেক খরচে খাবার প্রস্তুত করতে পারবেন।
  3. নিজ ইচ্ছামত পরিমাণের খাবার তৈরি করতে পারবেন, সুতরাং একসাথে অনেক অর্থ ব্যায়ের প্রয়োজন নেই।
  4. খাবারের খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রতি পিস ডিম উৎপাদন খরচ কিছুটা হলেও কম হবে।
  5. মুরগির স্বাস্থ্য এবং উৎপাদনশীলতার জন্য খাবারের মৌলিক যত উপাদান প্রয়োজন তা যুক্ত রয়েছে এই তালিকায়।

সেইসাথে সকল উপাদান কিভাবে মিশ্রণ করবেন সে ব্যাপারেও ধারাবাহিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এই আর্টিকেলে। অতএব, গুরুত্বপূর্ণ এই আর্টিকেল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার পরামর্শ রইলো।

ঘরোয়া পদ্ধতিতে লেয়ার মুরগির খাবার তালিকাঃ

লেয়ার মুরগির খাবার তালিকা প্রস্তুত করতে আমরা চিন্তা করেছি কিভাবে একজন প্রান্তিক খামারিও এই খাবারের  উপাদান সহজে বাজার থেকে সংগ্রহ করে মুরগিকে প্রদান করতে পারেন।

নিম্নে প্রদানকৃত খাবার তালিকা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে একটি লেয়ার মুরগির জীবনধারণ এবং ডিম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ধরণের ভিটামিন, মিনারেল, ক্যালসিয়াম এবং প্রোটিনের কোন অভাব না হয়।

এখানে ১০০ কেজি খাবার প্রস্তুত করার জন্য একটি তালিকা প্রদান করা হয়েছে। আপনি চাইলে ৫০ কেজি, ২০০ কেজি, বা যেকোন পরিমাণের খাবার প্রস্তুত করতে পারবেন, শুধু মিশ্রণের অনুপাত ঠিক রেখে।

এই ১০০ কেজি খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত উপাদানের প্রায় ৯৮.৮১ কেজি উপাদান খুব সহজে হাতের নাগালেই পাওয়া যাবে।

অবশিষ্ট প্রায় ১.৪৪ কেজি উপাদান হচ্ছে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট যা আপনার নিকটস্থ পোলট্রি খাবার অথবা ঔষধ বিক্রি করে এমন দোকানে পাওয়া যাবে।

উপাদানের নামঃপরিমাণঃ
ভুট্টাঃ ৬০ কেজি।
ফিস মিলঃ ১১.৫৭ কেজি।
সয়াবিন মিলঃ ১৫.১১ কেজি।
লাইমস্টোন/চুনাপাথর গুঁড়াঃ ৬.৮০ কেজি।
পাথরের গুঁড়াঃ ৩ কেজি।
লবনঃ ১.২ কেজি।
খাবারের সোডাঃ ১৫০ গ্রাম।
লাইসিনঃ ১৬০ গ্রাম।
এনজাইমঃ ২০০ গ্রাম।
এন্টি সালমোনেলাঃ ২০০ গ্রাম।
টক্সিন বাইন্ডারঃ ১৫০ গ্রাম।
ডিসিপিঃ ৬১০ গ্রাম।
কলিনঃ ১২০ গ্রাম।
তৈলঃ ৯৮০ মিলি লিটার।
মোটঃ ১০০.২৫ কেজি।

উল্লেখ্য যে, লাল রঙ্গে লেখা উপাদানগুলোর নাম পড়ে বুঝতে সমস্যা হলে চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। যেকোন ভেটেরিনারি ঔষধের দোকানে গিয়ে বললেই দিয়ে দিবে।

তালিকা অনুযায়ী লেয়ার মুরগির খাবার তৈরি পদ্ধতিঃ

উপরে উল্লেখিত লেয়ার মুরগির খাবার তালিকা অনুসরণ করে কিভাবে খাবারের মিশ্রণ তৈরি করবেন সে ব্যাপারে নিম্নে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, অনুগ্রহ করে ইহার ধারাবাহিকতা বজায় করুন।

লেয়ার-মুরগির-খাবার-তালিকা-ভুত্তা-ভাঙ্গা

  1. প্রথমে আপনাকে খাবার মিশ্রণের জায়গা ভালোভাবে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। যেহেতু অনেক পরিমাণের খাবার একসাথে মিশ্রণ করা হবে তাই কোন ঘরের পরিষ্কার ফ্লোর, অথবা ত্রিপল ব্যবহার করতে পারেন।
  2. মিশ্রণ তৈরির পূর্বে উভয় হাতে গ্লাভস এবং মুখে মাস্ক লাগিয়ে নিতে হবে। কারণ কিছু কিছু উপাদান সরাসরি হাতে লাগলে এবং নাকের ভিতরে ঢুকলে অসুবিধা হতে পারে।
  3. যেহেতু সবগুলো উপাদান মিশিয়ে শুকনো খাবার তৈরি করা হবে, তাই মিশ্রণের পূর্বে খাবারের উপাদানগুলো ইহার বস্তায়/ প্যাকেটে শুকনো এবং ঝরঝরে আছে কি না খেয়াল রাখতে হবে। উপাদানের কোন একটি পানিতে ভেজা/ড্যাম্প হলে উক্ত উপাদান মুরগিকে খাবার হিসেবে দেওয়া যাবে না।
  4. সবকিছু ঠিক থাকলে এবার খাবারের মিশ্রণ তৈরির জন্য সর্বপ্রথম ভুট্টা ভাঙ্গা মিশ্রণের জায়গায়/পাত্রে ঢালতে হবে এবং ফ্লোরে এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে ইহার সাথে অন্যান্য উপাদান মিক্স করা সহজ হয়। অর্থাৎ, উপাদানগুলো স্তুপ আকারে না রেখে একটু ছড়িয়ে রাখতে হবে।
  5. তারপরের উপাদান হিসেবে সয়ামিল ঢালতে হবে। পূর্বেই মতই ইহাকেও ভুট্টার উপরে ছড়িয়ে রাখতে হবে। কোন কারণে সয়ামিল বাজার থেকে কিনতে না পারলে সরিষার খৈল মিশ্রণে যুক্ত করতে পারবেন।
  6. এরপর, লেয়ার মুরগির ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণের জন্য চুনাপাথরের গুঁড়া, বা লাইমস্টোন পাউডার তালিকায় উল্লেখিত পরিমাণমত যুক্ত করতে হবে।
  7. তারপরের উপাদান হিসেবে ফিসমিল যুক্ত করতে হবে, অথবা বিকল্প হিসেবে যেকোন প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যুক্ত করতে পারেন।
  8. এবার পাথরের মিহি দানা তালিকায় উল্লেখিত পরিমাণে নিয়ে উপরোক্ত উপাদানের উপর সরাসরি ছিটিয়ে না দিয়ে আলাদা একটি পাত্রে আরও কিচু উপাদানের সাথে মিক্স করার পর ভুট্টা, ফিসমিল, সয়ামিল এবং চুনাপাথরের গুঁড়ার উপরে ছিটিয়ে দিতে হবে।
  9. এবার আলাদা পাত্রে রাখা পাথরের গুঁড়ার সাথে তালিকায় উল্লেখিত পরিমাণমত বাকি সকল উপাদান, অর্থাৎ লাইসিন, লবন, খাবারের সোডা, এনজাইম, এন্টি সালমোনেলা, ডিসিপি, কলিন যুক্ত করে ভালোভাবে মিক্স করতে হবে।
  10. আলাদা পাত্রে রাখা এসব উপাদানের মিশ্রণ যাতে ভালোভাবে তৈরি হয় এবং বাতাসে উড়ে না যায় তাই তাদের সাথে কিছু পরিমাণের তৈল যুক্ত করতে হবে যার পরিমাণ তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।
  11. তারপর, আলাদা পাত্রের মিশ্রণকে ফ্লোরে রাখা খাবারের উপাদানের উপর ছিটিয়ে দিতে হবে এবং সবগুলো উপাদানকে একসাথে এমনভাবে মিক্স করতে হবে যাতে প্রতিটি মুরগি খাবার খেলে সমানভাবে ভিটামিন, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি উপাদান গ্রহণ করতে পারে।
  12. মিশ্রণটি পরিপূর্ণভাবে তৈরি করার পর সবগুলো খাবার একদিনে ব্যবহার করার প্রয়োজন না পড়লে, সেক্ষেত্রে কোন পরিষ্কার ড্রামে বা খাবার নষ্ট না হয়ে যায় এমন পাত্রে সর্বোচ্চ ০৩ দিন পর্যন্ত রাখতে পারবেন।
লেয়ার-মুরগির-খাবার-তৈরি-পদ্ধতি

উল্লেখ্য যে, হাত দিয়ে খাবারের মিশ্রণ তৈরি করতে ঝামেলাপূর্ণ মনে হলে বেলচা ব্যবহার করতে পারেন।

লেয়ার মুরগি প্রতিদিন কত গ্রাম খাবার খায়?

একটি লেয়ার মুরগি প্রতিদিন কত গ্রাম খাবার খাবে তা মুরগির জাত, ওজন, ডিম পাড়ার বয়স ইত্যাদির উপর নির্ভর করে ১১০ গ্রাম থেকে ১৫০ গ্রামের মত খাবার খায়।

উল্লেখ্য যে, সবগুলো মুরগি যে একই পরিমাণ খাবার খাবে তা নয়, বরং একেক মুরগির খাবারের চাহিদা একেক রকম হতে পারে। তাছাড়া, খামারে মুরগিগুলোর ব্যবস্থাপনা কিভাবে করা হচ্ছে ইহার উপরও মুরগির খাবারের পরিমাণ কম বেশি হতে পারে। সুতরাং, উপরোক্ত খাবারের পরিমাণ একটি সাধারণ হিসাব।

লেয়ার মুরগির খাবার দেওয়ার নিয়মঃ 

লেয়ার মুরগির প্রতিদিনের খাবার বিভিন্নভাবে দেওয়া যায়, যেমনঃ-

  • স্বাধীনভাবে খাবার প্রদানঃ- এই পদ্ধতি অনুযায়ী খামারের সকল লেয়ার মুরগির জন্য প্রতিদিন সর্বমোট যতটুকু খাবার প্রয়োজন তার সবটুকু একসাথে খাবারের পাত্রে প্রদান করা হয়। এই পদ্ধতিতে মুরগি তার যখন ইচ্ছা তখন খাবার খেতে পারে।
  • নির্ধারিত সময়ে খাবার প্রদানঃ- এই পদ্ধতিতে খামারের মুরগিগুলোকে একইসময়ে সব খাবার না দিয়ে সকাল-দুপুর-বিকাল, অথবা সকাল-বিকাল এভাবে ২/৩ বেলা নিয়ম করে খাবার দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে খাবার অপচয় অনেকটা কম হয়ে থাকে।  
  • প্রযুক্তির মাধ্যমে খাবার প্রদানঃ- এই পদ্ধতিতে অটোমেশনের মাধ্যমে মুরগিকে খাবার প্রদান করা হয়। সাধারণত কনভেয়ার বেল্ট/ফিডারের মাধ্যমে একটু পরপর মুরগিকে খাবার প্রদান করা হয়। ইহা বেশিরভাগ সময়ে বৃহৎ আকার খামারে ব্যবহৃত হয়।

মোটকথা, আপনার খামার থেকে কোন কোন সময়ে ডিম সংগ্রহ করছেন তার উপর নির্ভর করে আপনি একটা রুটিন করে দৈনিক ০২ থেকে ০৩ বার খাবার প্রদান করতে পারেন। তবে, যতবারই খাবার প্রদান করেন না কেন, খাবার প্রদান করার সময় যেন প্রতিদিন একই থাকে।

উদাহারণস্বরূপঃ আপনার খামারে ১০০ লেয়ার মুরগি থাকলে তাদের জন্য দৈনিক নুন্যতম (১২০ গ্রাম x ১০০ মুরগি= ১২,০০০ গ্রাম) বা ১২ কেজি খাবার প্রয়োজন।

উক্ত ১২ কেজি খাবার ০৩ ভাগ করে সকাল ০৭ টায় একবার, দুপুর ১১ টায় একবার এবং বিকাল ০৪ টায় একবার, এইভাবে দিনে ৪/৫ ঘণ্টা পরপর খাবার ভাগ করে দিতে পারেন।

আরও জানুনঃ মুরগিকে কেন রসুন খাওয়ানো হয়?

লেখকের উপদেশঃ

আজকের আর্টিকেলে উল্লেখিত খাবার তালিকা অনুযায়ী মিশ্রণ প্রস্তুত করে আপনার খামারের মুরগির সংখ্যা এবং দৈনিক খাবারের পরিমাণ হিসাব করে মোট মিশ্রণকে পৃথক পৃথক ড্রাম/বস্তায় রেখে দিতে পারেন।

অথবা, আপনি চাইলে প্রতিদিন প্রতি বেলায় কি পরিমাণ খাবার প্রদান করবেন, সেই অনুযায়ী মোট মিশ্রণকে ছোট ছোট ভাগ করে বস্তায় রাখতে পারেন।

অর্থাৎ, মোট মিশ্রণকে আপনি চাইলে দৈনিক খাবারের পরিমাণ ভিত্তিক, অথবা প্রতি বেলার খাবারের পরিমাণ ভিত্তিক ভাগ করে সংরক্ষণ করতে পারেন।  এতে আপনার প্রতিদিন খাবার প্রস্তুত করা এবং মুরগিকে খাবার প্রদান করার জন্য আলাদাভাবে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হবে না।

আশা করছি, আপনার খামারের জন্য লেয়ার মুরগির খাবার তালিকা, কিভাবে খাবার প্রস্তুত করবেন, প্রতিদিন কি পরিমাণ খাওয়াবেন এবং প্রতিদিন কতবার খাওয়াবেন এসব বিষয়ে পরিপূর্ণ একটি ধারণা এই আর্টিকেল থেকে পেয়েছেন। ধন্যবাদ।

আর্টিকেলটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।

Leave a Comment