কুচিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা।

কুচিয়া মাছ চাষে অন্যান্য মাছের তুলনায় লাভ বেশি, রয়েছে এই মাছের বিশাল বাজার, আবার মাছ চাষের প্রতিযোগিতাও তুলনামূলকভাবে কম।

তাইতো কুচিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে অনেকেই জানতে আগ্রহী, কারণ এই  মাছ চাষে জায়গা লাগে কম, পরিচর্যার ঝামেলাও কম এবং সুযোগ রয়েছে বিদেশে রপ্তানির।

স্বল্প জায়গায় এই মাছ চাষ করে তুলনামূলক ভালো পরিমাণের অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকলেও, খুব একটা সুযোগ নেই কুচিয়া মাছে চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার।

আজকের এই আর্টিকেলে কুচিয়া মাছের চাষ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানোর চেষ্টা করা হবে, সেইসাথে কুচিয়া মাছের পোনা কোথায় পাওয়া যাবে, এবং কুচিয়া মাছের খাবার কি এসব ব্যপারে আলোচনা করা হয়েছে।

কুচিয়া মাছ চাষ পদ্ধতিঃ

কুচিয়া মাছ চাষ করার পূর্বে আপনাকে জেনে নিতে হবে যে, আপনি যে বাজারে, বা ক্লায়েন্টের কাছে মাছ বিক্রি করতে যাচ্ছেন, তাদের কাছে কোন প্রজাতির কুচিয়া মাছের চাহিদা রয়েছে।

কারণ, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কুচিয়া মাছের অনেক চাহিদা থাকলেও নিজ দেশে অর্থাৎ, বাংলাদেশ এবং ভারতের মত দেশে এই মাছের ভোক্তা সরাসরি খুঁজে পাওয়া অনেক কঠিন।

স্থানীয়ভাবে প্রতি কেজি কুচিয়া মাছ খুব ভালো দামে বিক্রি হলেও, দেশের কিছু সংখ্যক মানুষ এই মাছ ক্রয় করে থাকে বলে কুচিয়ার জন্য দেশের বাজার খুব একটা ভাল নয়।  

বেশিরভাগ খামারি যারা কুচিয়া মাছ চাষ করে থাকেন, তারা দেশের বাহিরের ক্লায়েন্টদের টার্গেট করে থাকেন। তাই, ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী কুচিয়া মাছের জাত এবং আকার জেনে নিতে হবে।

যেমনঃ জাপানি কুচিয়া, আমেরিকান কুচিয়া, ইউরোপিয়ান কুচিয়া, ইত্যাদি। এইভাবে কুচিয়ার জাত সম্পর্কে অবগত হয়ে কুচিয়ার পোনা সংগ্রহ করতে হবে।

বিভিন্ন-জাতের-কুচিয়া-মাছ

কুচিয়া মাছের বিভিন্ন প্রজাতিভেদে তাদের আয়ু ১৮ বছর, বা তার অধিক হয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, কুচিয়ার দীর্ঘ এই আয়ুর মধ্যে তারা কেবল একবারই প্রজনন করে থাকে।

অতএব, আপনি যতবারই কুচিয়া মাছ চাষ করতে যাবেন, ততবারই কুচিয়ার পোনা সংগ্রহ করতে হবে। কুচিয়া মাছ সাধারণত সমুদ্রে প্রজনন করে থাকে এবং পরবর্তীতে সমুদ্রের উপকূল থেকে ছোট ছোট কুচিয়া মাছ সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।

তবে, বাংলাদেশ এবং ভারতে স্থানীয় যেসব কুচিয়া রয়েছে তারা অন্যান্য সাধারণ মাছের মতই পুকুরের মধ্যেই প্রজনন করে থাকে। আপনি নিজ থেকে কুচিয়াকে প্রজনন করাতে গেলে দীর্ঘদিন ধরে তাদের লালনপালন করতে হবে, তাই অধিকাংশ মাছ চাষীরা কুচিয়ার পোনাই সংগ্রহ করে থাকেন। 

আপনি কিভাবে সহজেই কুচিয়ার পোনা সংগ্রহ করবেন, সে ব্যাপারেও এই আর্টিকেলে দিক নির্দেশনা দেওয়া হবে।

পোনা সংগ্রহ করা হয়ে গেলে, আপনি কত কেজির কুচিয়া উৎপাদন করবেন এবং আপনি তাদের কি কি খাদ্য প্রদান করেছেন ইহার উপর ভিত্তি করে ৪-৫ মাস কুচিয়া লালনপালন করা লাগতে পারে। তবে, লালনপালনের এই সময় চাষীভেদে ভিন্ন হতে পারে।

কুচিয়া মাছ চাষের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হচ্ছে এই মাছের সহনশীলতা। অল্প পরিমাণ জায়গায় অনেক পরিমাণের কুচিয়া একসাথে পালন করা যায় বলে এই মাছ পুকুর ছাড়াও যেকোন ধরণের পানির রিজার্ভার, বা ট্যাংকে সুন্দরভাবে চাষ করা যায়।

তবে, পুকুরের মধ্যে কুচিয়া চাষ করতে হলে বিশেষ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ, কুচিয়া মাছ মাটি গর্ত করে পুকুরের বাহিরে চলে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে।

তাই, পুকুরে এই মাছ চাষ করতে চাইলে পুকুরের নিচ থেকে উপর পর্যন্ত চার দিকে জালি (নেট) লাগিয়ে দিতে হবে, অথবা অন্যকোন মাধ্যমে কুচিয়ার চলাচল বন্ধ করে দিতে হবে।

পুকুরে-কুচিয়া-মাছ-চাষ-পদ্ধতি

আপনার বাজেট অনুযায়ী আপনি চাইলে কংক্রিট, এমনকি ত্রিপল দিয়েও কমদামে পানির রিজার্ভার তৈরি করতে পারেন। তবে, মনে রাখতে হবে যে, যেভাবেই আপনি পানির রিজার্ভার তৈরি করেন না কেনো, গুণগতমান বজায় রাখার জন্য পানি সার্কুলেট করার ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং পানির তাপমাত্রা ২৫(+/-) ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের আশেপাশে রাখতে হবে।

পানিকে ঠান্ডা রাখার জন্য পানির উপরে কচুরিপানা দিতে পারেন। তাছাড়া, কুচিয়া মাছ অন্ধকার পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে, সুতরাং পানির উপরে কচুরিপানা দেওয়া হলে তাদের জন্য বসবাসের একটি উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে।

কুচিয়া মাছ যাতে তাড়াতাড়ি বড় হতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে নিয়মিত পানি পরিষ্কারের ব্যবস্থাও রাখতে হবে, কারণ অনেকগুলো কুচিয়া মাছ একসাথে বসবাস করার ফলে পানি দ্রুত ময়লা হয়ে থাকে।

যদিও অনেকগুলো কুচিয়া মাছ একসাথে স্বল্প পরিসর জায়গায় চাষ করা যায়, খেয়াল রাখতে হবে কুচিয়ার আকার অনুযায়ী তাদের একটি গ্রুপ করে আলাদা করার জন্য।

কারণ, সবগুলো মাছের বৃদ্ধি একই সময়ের ভিতরে একই রকম নাও হতে পারে। তাই, কুচিয়ার সাইজ অনুযায়ী তাদের অন্যত্র পৃথকীকরণ করতে হবে, বা ভিন্ন পানির রিজার্ভারে রাখতে হবে। অন্যথায়, বড় হয়ে যাওয়া কুচিয়া মাছ ছোট কুচিয়াদের খেয়ে ফেলতে পারে।

আপনি কতটুকু দক্ষতার সহিত মাছ চাষ করছেন, তার উপর ভিত্তি করে প্রতি এক থেকে দেড়মাস পরপর মাছকে তার সাইজ অনুযায়ী আলাদা করতে হবে।

কুচিয়ার সাইজের ব্যপারে আরও একটি তথ্য জানা উচিত যে, কুচিয়ার অর্ডার সাইজ অনুযায়ী হয়ে থাকে। সুতরাং, আপনার কাঙ্ক্ষিত সাইজের কুচিয়া বিক্রি করার জন্য এমনিতেই তাদের অন্য সাইজের কুচিয়া থেকে আলাদা করে রাখতে হবে।

কুচিয়া মাছের ওজন যখন ২০০ গ্রাম বা তার অধিক হয়, তখন থেকে বিক্রি করা যায়। প্রকৃত কত ওজনের কুচিয়া আপনার তৈরি করতে হবে তাও আপনার ক্লায়েন্টের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।

উল্লেখ্য যে, একই বয়সী কুচিয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারী কুচিয়া ওজনে বেশি হয়ে থাকে। যদি একটি পুরুষ কুচিয়ার ওজন ২০০ গ্রাম হয়, তাহলে সমবয়সী একটি নারী কুচিয়ার ওজন ২৫০-৩০০ গ্রাম হতে পারে। 

ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী কুচিয়া মাছ আলাদা করার পর তাদের গুনগত মান যাচাই করার জন্য অন্ততপক্ষে ০১ দিন খাবার না দিয়ে পরিষ্কার পানিতে রেখে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

কুচিয়া মাছের সাধারণ একটি রোগ হচ্ছে তাদের গায়ের বিভিন্ন জায়গা ফুলে উঠতে পারে, বা পচে যেতে পারে। এমন অবস্থায় অবশ্যই রোগা কুচিয়াকে অন্য সুস্থ কুচিয়া থেকে আলাদা করতে হবে।

কুচিয়া-মাছ-চাষের-জন্য-ট্যাংক

মাছের গায়ে পচন ধরলে যদিও ইহার ঘরোয়া চিকিৎসা আছে, কিন্ত আপনি যেহেতু এই মাছ বিদেশে রপ্তানি করবেন, সেহেতু ঝুঁকি এড়াতে একজন অভিজ্ঞ মৎস্য চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করে চিকিৎসা করা উচিত।

সবকিছু ঠিক থাকলে, মাছ কিভাবে ডেলিভারি করা হবে, জীবিত নাকি প্রসেস করে? সে ব্যপারে নিশ্চিত হয়ে ক্লায়েন্টের কাছে মাছ পাঠাতে হবে।

যেহেতু, এই মাছ সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি করা হয় না এবং ক্লায়েন্ট একবার অসন্তুষ্ট হলে পরবর্তীতে অর্ডার না করারও সম্ভাবনা রয়েছে, সেহেতু প্রতিষ্ঠানের সুনাম ধরে রাখার জন্য সর্বদা গুণগত মানের প্রতি সচেতন হতে হবে। 

কুচিয়া মাছ যাতে তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায় সেইজন্য তাদেরকে দিতে হবে উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার। কিভাবে কুচিয়ার খাবার তৈরি করবেন সে সম্পর্কেও আমরা এই আর্টিকেলে জানার চেষ্টা করবো।

কুচিয়ার মাছের খাবার কি?

কুচিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে ইতঃপূর্বে আমরা বেশ কয়েকবার বলেছি যে, কুচিয়া মাছ বিক্রির আগ পর্যন্ত কতদিন লালনপালন করতে হবে এবং কোন সাইজের কুচিয়া উৎপাদন করা সম্ভব এসব কিছু নির্ভর করছে মাছকে কিভাবে খাবার প্রদান করছেন ইহার উপর।

  • অনেকেই খৈল, ধানের কুড়া, বেসন ইত্যাদি মিশ্রিত করে অন্যান্য সাধারণ মাছের মত খাবার তৈরি করে থাকে যা অন্ততপক্ষে কুচিয়া মাছের ক্ষেত্রে আশানুরূপ ফলাফল বয়ে আনতে পারবে না।
  • কুচিয়া মাছের জন্য প্রয়োজন উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার। কুচিয়ার ওজন দ্রুত বৃদ্ধিতে সবচেয়ে আদর্শ খাবার হচ্ছে ছোট ছোট মাছের পোনা।
  • কুচিয়া মাছ ছোট ছোট জীবন্ত পোনা মাছ খেতে পছন্দ করে। পুকুরে এমন অনেক মাছ পাওয়া যায় যা সাধারণত মানুষ খায় না বা খেতে চায় না, আপনি চাইলে সেইসব মাছের পোনা কুচিয়াকে প্রদান করতে পারেন।
  • আবার পরিমাণমত মাছের পোনা সংগ্রহ করতে না পারলে মাছের সাথে অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে ভর্তা বানিয়েও খাবার প্রদান করতে পারেন। আপনি চাইলে মাছের ভর্তার সাথে কেঁচো, শামুক, ঝিনুক, ইত্যাদি যুক্ত করতে পারেন। তবে এই মিক্সিং পদ্ধতিতে প্রোটিনের পরিমাণ কিছুটা হলেও হ্রাস পেতে পারে।

মোটকথা, আপনি যত বেশি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার প্রদান করবেন তত তাড়াতাড়ি কুচিয়া তার কাঙ্ক্ষিত ওজন প্রাপ্ত হবে।

কুচিয়া মাছের পোনা কোথায় পাওয়া যায় ?

কুচিয়া মাছ চাষে লাভ বেশি, কম জায়গায় অধিক কুচিয়া চাষ করার যায়, কুচিয়া মাছের চাহিদা দেশের বাহিরে অনেক রয়েছে, কুচিয়া মাছ বিদেশে খুব সহজে বিক্রি করার যায় এসব ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যেও একটি ঝামেলাপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কুচিয়ার পোনা সংগ্রহ করা।

অন্যান্য মাছের পোনার মত কুচিয়ার পোনা খুব সহজে পাওয়া যায় না, কারণ আমরা আগেও বলেছি যে, কুচিয়া মাছের চাহিদা দেশের মধ্যে অনেক কম।

কুচিয়া মাছের পোনা সংগ্রহ করতে হলে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট, ময়মনসিংহ, অথবা দেশের যেকোন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মৎস্য অধিদপ্তরে যোগাযোগ করতে হবে।

বাংলাদেশে সাধারণত প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের দিকে কুচিয়া মাছের পোনা খামারিরা সংগ্রহ করা হয়ে থাকেন। মৎস্য অধিদপ্তরে পোনা সংগ্রহের জন্য আবেদন করা হলে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দ্বারা প্রস্তুতকৃত তালিকা অনুযায়ী কুচিয়ার পোনা বিতরণ করা হয়ে থাকে।

আরও পড়ুনঃ সাকার মাছ কি আসলেই খাওয়া যায়?

কুচিয়া মাছ চাষ সম্পর্কে লেখকের মন্তব্যঃ

মাছের জাত অনুযায়ী একেক মাছের খাবারের চাহিদা, বসবাসের পরিবেশ, রোগবালাই, বাজারজাতকরণ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সুতরাং, যারা পেশাগতভাবে কুচিয়া মাছ চাষ করে লাভবান হতে চাচ্ছেন, তাদের প্রতি আমাদের পরামর্শ রইল যে, আপনাদের নিজ এলাকায় অবস্থিত মৎস্য অধিদপ্তরে যোগাযোগ করে কিভাবে কুচিয়া চাষের উপর একটি প্রশিক্ষন নেওয়া যায় ইহার খোঁজখবর নেওয়া।

প্রশিক্ষণ ছাড়া খামার বিষয়ক কোন ব্যবসায় জড়িত না হওয়াই উত্তম। অন্যের খামারের ধারণকৃত ভিডিও, বা খবর দেখে হুটহাট নিজে খামার করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ, কেউই তার খামারের সফলতার মূল রহস্য সবার সামনে শেয়ার করবে না।

আর যেহেতু কুচিয়া মাছ চাষ সবাই সচরাচর করে থাকেন না, তাই এই ধরণের মাছের খামারের ব্যপারে অন্যের কাছ থেকে সরাসরি শেখার সুযোগ কম রয়েছে। অতএব, চেষ্টা করতে হবে স্বল্প মেয়াদের হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে একটি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা।

আশাকরছি, কুচিয়া মাছ চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রাথমিক একটি স্পষ্ট ধারণা এই আর্টিকেল থেকে পেয়েছেন। কুচিয়া মাছ চাষ সম্পর্কে আরও কিছু জানার থাকলে আপনারা কমেন্ট করে প্রশ্ন করতে পারেন, আমরা চেষ্টা করবো সবার কমেন্টের উত্তর একসাথে একটি আর্টিকেল আকারে প্রকাশ করতে। ধন্যবাদ।

আর্টিকেলটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।

Leave a Comment