গাভীকে বীজ দেওয়ার পর করণীয় এবং বীজ দেওয়ার সঠিক সময়!

এগ্রোফার্মলি” কৃষি ওয়েবসাইটের আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা জানবো, গাভীকে বীজ দেওয়ার পর করণীয় কি, অর্থাৎ আপনার গাভীকে বীজ দেওয়ার পর কি কি দিক বিবেচনা করা উচিত যাতে গাভীর গর্ভধারণের নিশ্চয়তা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়।

আমরা চেষ্টা করবো যে, খুব সহজ ভাষায় আজকের বিষয়ের উপর আলোচনা করতে, যাতে গ্রামের একজন সাধারণ খামারিরও বুঝতে কোন অসুবিধা না হয় এবং এই আর্টিকেল সম্পূর্ণ পড়ার পর গাভীকে বীজ দেওয়ার পর করণীয় কি এই প্রশ্নের উত্তর পরিপূর্ণভাবে পেতে সক্ষম হোন।

গাভীকে বীজ দেওয়ার সঠিক সময়ঃ

আপনার খামার, অথবা বাড়ির গাভীকে বীজ দেওয়ার পর কি কি কাজ করতে হবে তা জানার পূর্বে আমরা মনে করি যে, গাভীকে বীজ দেওয়ার সঠিক সময় সম্পর্কে পরিষ্কার একটি ধারণা থাকা উচিত।

কারণ, সঠিক সময়ে গাভীকে বীজ না দিতে পারলে পরবর্তীতে গাভীর পিছনে অতিরিক্ত সময় এবং অর্থ ব্যয় করার কোন প্রশ্নই উঠে না। সুতরাং, আর্টিকেলের এই অংশে আমরা খুব সংক্ষেপে জানার চেষ্টা করবো আপনার গাভীকে বীজ দেওয়ার সঠিক সময় কখন হতে পারে, যাতে এই সময়ের ভিতরে বীজ দেওয়া হলে গাভী বীজ ধারন করে রাখতে পারে।

একটি গাভীর বেশ কিছু আলামত দেখে বুঝা যায় যে, গাভী হিটে আসছে কি না। সাধারণত একটি গাভী হিটে আসার প্রস্তুতি পর্ব থেকে শুরু করে নিষ্ক্রিয় পর্ব পর্যন্ত মোট চারটি পর্ব অতিবাহিত করে থাকে। এই চারটি পর্ব নিয়ে আমরা হয়ত পরবর্তীতে আরেকটি আর্টিকেলে বিস্তারিত আলোচনা করবো এবং আজকে শুধু গাভী হিটে আসার লক্ষণগুলো সরাসরি উল্লেখ করা হবে।

নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো দেখে আপনার বুঝতে হবে যে, আপনার গাভী হিটে এসেছে এবং এই সময়ই হচ্ছে গাভীকে বীজ দেওয়ার সঠিক সময়ঃ-

  • হিটে আসা একটি গাভীর সাধারণ আচরণগত কার্যকলাপ কিছুটা বেশি হবে।
  • গাভী অনেকটা অস্থির থাকবে এবং এদিক সেদিক ছোটাছুটি করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে।
  • গাভীর খাবার দাবারের প্রতি আগ্রহ কিছুটা কম থাকতে পারে।
  • হিটে আসা গাভীর মধ্যে সাধারণত জোরে জোরে ডাকার বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়।
  • অন্য গাভীর শরীরে মুখ দিয়ে শোঁকতে পারে বা লাফ দিয়ে উঠতে পারে।   
  • এবং গাভীর পরিষ্কার শ্লেষ্মা স্রাব নির্গত হতে পারে।
গাভীকে-বীজ-দেওয়ার-সঠিক-সময়

উপরোক্ত সবগুলো লক্ষণ একসাথে একটি গাভীর মধ্যে না-ও পাওয়া যেতে পারে, আবার মাত্র একটি লক্ষণ দেখে গাভীর হিটে আসার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া ঠিক হবে না। একাধিক লক্ষণগুলোর উপস্থিতির মাধ্যমে হিটে আসার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ২৪ ঘণ্টার ভিতরে গাভীকে বীজ দেওয়া উচিত।

গাভীকে বীজ দেওয়ার পর করণীয়ঃ

একটি গাভীকে বীজ দেওয়ার পর মূলত কি কি কাজ করতে হবে, বা কি কি দিক বিবেচনা করা উচিত তা নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ-

  • সঠিক সময়ে বীজ দেওয়ার পর, গাভীর সঠিক জায়গায় বীজ দেওয়া হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। আপনি যদি নিজে নিজে বীজ দিয়ে থাকেন, তাহলে একজন পশু চিকিৎসকের মাধ্যমে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে হবে। তাছাড়া, গাভীর প্রজনন অঙ্গে কোন ধরনের সমস্যা হয়েছে কি না তাও চেক করতে হবে।
  • বীজ দেওয়ার আনুমানিক একমাসের শেষের দিকে গাভীর গর্ভাবস্থার ডায়াগনোসিস করাতে হবে। ডায়াগনোসিস করার পর যদি গাভী গর্ভবতী হিসেবে বিবেচিত না হয়, তাহলে পুনরায় অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে বীজ দিতে হবে।
  • একজন পশু চিকিৎসক, বা পুষ্টিবিদের সাথে আলোচনা করে গাভীর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। পর্যাপ্ত পুষ্টি প্রদানের মাধ্যমে গাভীর সামগ্রিক প্রজনন ব্যবস্থাকে উন্নত করা যেতে পারে এবং গাভীর গর্ভধারণকে সফল করা যেতে পারে।
  • গর্ভাবস্থায় গাভীকে যতটুকু সম্ভব চাপমুক্ত রাখতে হবে। অহেতুক গাভীর কাছে লোকজনের যাওয়া আসা করা, যানবাহনের শব্দের মাধ্যমে গাভীকে আতঙ্কিত করা, পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা বারবার পরিবর্তন করা, ইত্যাদি থেকে গাভীকে নিরিবিলি পরিবেশে রিলাক্সে রাখতে হবে।
  • গাভীর জন্য হাটা চলাফেরার ব্যবস্থা করে দিয়ে হালকা ব্যায়ামের সুযোগ  করে দিতে হবে। একদম বন্দি অবস্থায় গাভী পালন করা, বা অতিরিক্ত ব্যায়াম করানো উভয়টি গাভীর গর্ভাবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
  • গাভী এবং বাছুর উভয় যাতে সুস্থ্য থাকে সেজন্য টিকাদানের জন্য একটি সময়সূচী মেনে চলুন। আপনার গাভীর জন্য কোন ধরণের টিকা প্রয়োজন সে বিষয়ে জানতে অবশ্যই একজন পশু চিকিৎসকের পরামর্শের প্রয়োজন রয়েছে।
  • বাচ্ছা প্রসবের সময় হয়ে গেলে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। বাচ্ছা জন্মদানের সময় কোন ধরণের জটিলতা লক্ষ্য করলে, অবশ্যই অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে গাভীকে সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ডেলিভারির পরও গাভীর প্রসবোত্তর যত্ন নিতে হবে, গাভীর জরায়ুতে কোন ধরণের সংক্রমণ হচ্ছে কি না, ইত্যাদি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
  • বীজ দেওয়া থেকে শুরু করে বাছুর জন্ম হওয়া পর্যন্ত যা যা করেছেন, অর্থাৎ কোনদিন বীজ দেওয়া হয়েছে, কোনদিন ডায়াগনোসিস করা হয়েছে, কোনদিন টিকা দেওয়া হয়েছে, গাভীর শারীরিক কোন জটিলতা দেখা দিয়েছে কি না, ইত্যাদি সকল ঘটনা তারিখ অনুযায়ী খাতা কলমে লিখে রাখতে হবে।
  • আপনার লেখা রেকর্ড একজন পশু চিকিৎসককে দেখিয়ে গাভীর সার্বিক গর্ভাবস্থার সমস্যা এবং দক্ষতা মূল্যায়ন করে গাভীর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতে গাভীকে কিভাবে প্রজনন করানো উচিত সে ব্যপারে পরিকল্পনা করতে হবে।

এই ছিলো একটি গাভীকে বীজ দেওয়ার পর করণীয় কি সে বিষয়ে মৌলিক ধারণা। এখানে একটি কথা বলে রাখা উচিত যে, গাভীর জন্য বীজ ভালো জায়গা/প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করতে হবে যাতে বীজের গুণগত মান উন্নত থাকে। তাছাড়া, একই শেডে গাভী এবং ষাঁড় খুব কাছাকাছি না রাখাই উত্তম।

আরও পড়ুনঃ কিভাবে আপনার গাভীর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করবেন?

লেখকের সমাপনী মন্তব্যঃ

কেউ যদি প্রশ্ন করে, গাভীকে বীজ পর দায়িত্ব বেশি, নাকি বীজ দেওয়ার পূর্বে দায়িত্ব বেশি? ইহার সহজ উত্তর হচ্ছে, বীজ দেওয়ার পূর্বে একজন খামারি, বা গাভীর মালিকের দায়িত্ব বেশি।

আপনি কোন জাতের বীজ, কোন কোয়ালিটির বীজ সংগ্রহ করছেন এবং কাকে দিয়ে বীজ দেওয়ার কাজ করাচ্ছেন এই বিষয়গুলোর উপর নির্ভর করছে আপনার গাভী গর্ভবতী হওয়া এবং সুস্থ বাছুর জন্ম দেওয়া।

বীজ দেওয়ার পূর্বে যেসব কাজগুলো রয়েছে তা একজন গাভীর মালিক চাইলে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। কারণ, আপনি চাইলে আপনার ইচ্ছামত যেকোন কোম্পানি থেকে বীজ সংগ্রহ করতে পারবেন, যাকে ইচ্ছা তাকে দিয়ে বীজ দেওয়াতে পারবেন।

গাভীকে-বীজ-দেওয়ার-পর-করণীয়

কিন্তু, বীজ দেওয়ার পর যা যা করতে হবে তার বেশিরভাগ কাজই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া করতে পারবেন না। সুতরাং, আমাদের মতে গাভীকে বীজ দেওয়ার পূর্বে একজন খামারির দায়িত্বটা বেশি।

এবং গাভীকে বীজ দেওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মূলত একটি প্রসেস বা রুটিন অনুসরণ করতে হবে, যা আমরা আজকের এই গাভীকে বীজ দেওয়ার পর করণীয় শীর্ষক আর্টিকেলের মাধ্যমে আপনাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছি।

আজকের মত এখানেই শেষ করছি, পরবর্তীতে আলোচনা হবে অন্য কোন বিষয় নিয়ে। ধন্যবাদ।

আর্টিকেলটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।

Categories Cow

Leave a Comment